সাম্প্রতিক পোস্ট

সংস্কৃতিবান মানুষ দায়িত্বশীল হয়

সংস্কৃতিবান মানুষ দায়িত্বশীল হয়

মানিকগঞ্জ থেকে সুবীর সরকার

যে সমাজের মানুষ ইতিবাচক সাংস্কৃতিক চিন্তাচেতনা ও কর্মধারার ভিতর জীবন যাপন করে, সে সমাজের বর্তমান ও পরবর্তী প্রজন্মের জীবন চর্চা হয় মানবিক, পরস্পরের  প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সংস্কৃতি মানবকতাকে শ্রদ্ধা করতে শেখায়। আমাদের এই বাংলাদেশের ভূখন্ডে সাংস্কৃতিক চর্চা ক্রমশ কমছে। অতীতে দেখা গেছে উন্নতমানের সাংস্কৃতিক চর্চা হতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। এ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সারাবছর অপেক্ষা করতো। এ সময় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিষয়টি ছিলো ব্যাপক। সঙ্গীত পরিবেশনা, নৃত্য পরিবেশনা, কবিতা আবৃত্তি, বিতর্ক, চিত্রাংকন, কুইজ প্রতিযোগিতা, যেমন খুশি তেমন সাজো, রচনা লেখা প্রতিযোগিতাসহ নানান বুদ্ধিবৃত্তিক ও নান্দনিক বিষয়গুলো থাকতো। তবে বর্তমানে এ ধরনের সংস্কৃতি চর্চা অনেকটা কমে গেছে।
dsc00308
বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলেও গান বাজনা, নাচের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। সংস্কৃতি বলতে কেবল গান, বাজনা বা নাচ নয়; সংস্কৃতি বলতে মানুষের সার্বিক জীবনযাত্রাকে নির্দেশ করে। সংস্কৃতি চর্চিত হলে মানুষ সংস্কৃতিবান হয়। তাদের আশপাশের বিভিন্ন প্রাণ, প্রকৃতি ও উপাদানের প্রতি দরদী হয়। তবে বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে মানুষ সময় পায় না প্রকৃতির দিকে মুখ ফেরাতে। সংস্কৃতি বলতে তারা কেবলমাত্র গান, বাজনার মধ্যেই থাকে। এই গান, বাজনা বা নাচ আবার গ্রামবাংলার চিরায়ত নৃত্য বা সঙ্গীত নয়। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে তারা বিদেশি নাচ, গানকে নিজের সংস্কৃতি ভেবে বসে।
dsc00247
দেশীয় সংস্কৃতিকে সুরক্ষা দিতে হলে তরুণদের জাগিয়ে তোলা প্রয়োজন। দেশের ঐতিহ্য, প্রথা, সংস্কৃতির প্রতি তাদের ভেতরে প্রেম জাগ্রত হতে হবে। এজন্য প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি খেলাধুলা, বিতর্ক, চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা, কুইজ প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে হবে। এসব প্রতিযোগিতার মূল বিষয়টি অবশ্যই দেশীয় সংস্কৃতি ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করতে হবে। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সম্প্রতি মানিকগঞ্জ জেলার ঘিউরসহ সদর উপজেলায় সাংস্কৃতিক প্রচারাভিযান পরিচালিত করছে বারসিকসহ তরুণরা। দেশের ভাষা, সাহিত্য, সঙ্গীতের প্রতি তাদের ভেতরে অনুরাগ জাগ্রত করাই এ অভিযানের মূল লক্ষ্য। এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের কারণে দেখা গেছে জেলায় কিছু দায়িত্বশীল ও সক্রিয় তরুণ আর্বিভূত হয়েছে, যারা শুধু সংস্কৃতি নয়; প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণকে রক্ষার জন্য সবাইকে সচেতন করে তোলার কাজ করেছে। তাই তো মানিকগঞ্জের হরিরামপুর, ঘিউর ও সদর উপজেলায় পাখি রক্ষা, নদী রক্ষা, ভাষাকে সংরক্ষণ করার জন্য তরুণরা নানান উদ্যোগ নিয়েছে।
dsc00304
এছাড়াও তারা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ, কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে তরুণরা অবদান রাখতে পারে সে বিষয়টি নিয়ে জলকবায়ু পাঠশালা করছে, অংশগ্রহণ করছে। এবং পেছন থেকে বারসিক তাদের সহযোগিতা করছে। অন্যদিকে দেশের সাহিত্য, কবিতা, ছড়া, প্রবাদ ইত্যাদি চর্চা করার জন্য তরুণরা পাঠাগার করেছে। নতুন প্রজন্মকে বই পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করছে। এভাবে দেশীয় সংস্কৃতি চর্চা এবং সংস্কৃতিকে রক্ষা ও সংরক্ষণ করার জন্য সচেতন তরুণ সমাজ আর্বিভাব হয়েছে।

তবে তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তাই সংস্কৃতিসহ প্রাণ, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা তৈরি এবং তরুণদের ভেতরে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রম আয়োজন করা প্রয়োজন। এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কেবলমাত্র নৃত্য ও সঙ্গীত পরিবেশনার ভেতরে যাতে আটকে রাখা না হয়; বরং কবিতা আবৃতি, গল্প বলা, দেশের প্রকৃতির ছবি অংকন করাসহ অন্যান্য নানন্দিক কাজে শিক্ষার্থীদের নিয়োজিত করতে হবে। এতে করে একটি সক্রিয়, দায়িত্বশীল ও সচেতন তরুণ সমাজ আর্বিভাব হবে। তরুণরা দায়িত্বশীল হলে, সক্রিয় হলে এবং সচেতন হলে একটি সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে। কেননা তরুণরাই আগামী দিনের নেতা।

happy wheels 2
%d bloggers like this: