Posted in

ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধ করে জাম্বুরা

সাতক্ষীরা থেকে বাহলুল করিম:
জাম্বুরা ঝাঝালো ও টক-মিষ্টি স্বাদের এক ধরণের মৌসুমী ফল। এটি কেউ খায় কাঁচা চিবিয়ে আবার কেউ খায় লবণ দিয়ে মাখিয়ে। আবার অনেকে জুস বানিয়েও খেয়ে থাকে। ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধে, জ্বর ও সর্দি-কাশিতে, মুখে ঘাঁ হলে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে, কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যায়, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে ও দাঁতের সমস্যায় জাম্বুরা ওষুধের মতো কাজ করে। এছাড়া স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে, শরীরের হাড় গঠনে, চুলের যত্নে, রক্ত পরিষ্কার করাসহ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে জাম্বুরায় রয়েছে নানাবিধ কার্যকরী গুণাগুণ।Jambura Fruit 2

রাস্তার আশেপাশে, বসতবাড়ির আঙিনায়, আগান-বাগানে, বাড়ির ছাদে জাম্বুরা গাছ দেখতে পাওয়া যায়। জাম্বুরা গাছ কাষ্ঠল প্রকৃতির এক ধরণের মাঝারি আকারের বৃক্ষ। এটি আকারে খুব বেশি বড় না হলেও এর শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হতে পারে। এর কা- শক্ত প্রকৃতির হয়।

জাম্বুরার পাতা অনেকটা বেলনাকৃতির হয়ে থাকে। পাতা অপরিণত অবস্থায় কলা পাতার রঙের হয় কিন্তু পরিণত অবস্থায় গাড় সবুজ বর্ণ ধারণ করে। পাতার শিরা-উপশিরাগুলো বাইরে থেকে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এর পাতায় সুন্দর সুবাশ পাওয়া যায়। জাম্বুরার ফুল গোলাকার ও সাদা রঙের হয়ে থাকে। ফুলেও মিষ্টি সুবাশ পাওয়া যায়।

Jambura Fruit 1জাম্বুরা ডালের অগ্রভাগে ঝুলে থাকতে দেখা যায়। ফল অপরিণত অবস্থায় গাঢ় সবুজ ও পরিণত অবস্থায় হালকা সবুজ রঙের হয়ে থাকে। ফল দেখতে গোলাকৃতির বা বেলনাকৃতির হয়। ফলের বাইরের অংশ নরম খোসা দ্বারা আবৃত থাকে। খোসার ভিতর নরম ফোমের মতো। কাঁচা ফলের বাইরের অংশ সবুজ কিন্তু ফল পাকলে হালকা সবুজ বা হলুদ বর্ণ ধারণ করে। খোসা ছাড়ালে ভিতরে সাদা বা গোলাপী রঙের কোয়া পাওয়া যায়। ফলের ওজন এক-দুই কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে।

সাতক্ষীরা অঞ্চলে প্রায় সব জায়গাতেই জাম্বুরা গাছ দেখতে পাওয়া যায়। জাম্বুরার স্থানীয় নাম বাতাবি লেবু। সাতক্ষীরা অঞ্চলের মানুষ এটিকে বাতাবি লেবু নামেই চেনে। এই অঞ্চলের মানুষ এটি লবণ দিয়ে মাখিয়ে খায়। আবার আনেকে মসলা দিয়ে ঝামিয়ে খায়। শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে বাতাবি লেবুর জুড়ি নেই।

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মৃগীডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা মো. মজিবর রহমান বলেন, “জাম্বুরা বা বাতাবি লেবুতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে। যা জ্বর ও সর্দি কাশিতে দারুণ উপকারী। এছাড়া বাতাবি লেবু খেলে শরীরের রক্ত পরিষ্কার হয়। নিয়মিত এক গ্লাস পরিমাণ বাতাবি লেবুর রস খেলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে।”

সাতক্ষীরা সদরের কাটিয়া সরকার পাড়ার বাসিন্দা নারগিস সুলতানা বলেন, “জাম্বুরা বা বাতাবি লেবু লবণ দিয়ে মিশিয়ে খাওয়া যায়। এটি টক-মিষ্টি স্বাদের হয়ে থাকে। বাতাবি লেবু কাঁচা অবস্থায় টক স্বাদের হয়। কিন্তু পাকলে মিষ্টি লাগে। এছাড়া কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যায়, হজম শক্তি বৃদ্ধিতে, মুখের রুচি বাড়াতে, ত্বকে ও চুলে পুষ্টি যোগাতে বাতাবি লেবু খেলে ভাল উপকার পাওয়া যায়।”

জাম্বুরার ওষুধী গুণাগুণ সম্পর্কে সতক্ষীরা শহরের পুষ্টির ফেরিওয়ালা রুহুল কুদ্দুস বলেন, “জাম্বুরা আমাদের অঞ্চলে বাতাবি লেবু নামে পরিচিত। এটি খেতে খুব সুস্বাদু ও টক-মিষ্টি স্বাদের হয়। ছোট-বড় সকলের কাছে বাতাবি লেবু খুবই প্রিয়। বাতাবি লেবু শুষ্ক বা হালকা আর্দ্র মাটিতে ভাল জন্মে। বাতাবি লেবুকে মহাঔষধী বৃক্ষ বলা হয়। বাতাবি লেবুতে ভিটামিন সি এবং বি রয়েছে। যা দাঁতের সমস্যায় ও হাড় গঠনে খুবই উপকারী ভূমিকা পালন করে থাকে। এছাড়া ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধে, স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে, মুখে ঘাঁ হলে, শরীরের অতিরিক্ত চর্বি কমাতে বাতাবি লেবু কার্যকরী ভূমিকা পালন করে থাকে। এছাড়া বাতাবি লেবু নানাবিধ পুষ্টির আঁধার।”

Jambura Fruit 5মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, জাম্বুরা বা বাতাবী লেবু এক প্রকার লেবু জাতীয় টক-মিষ্টি ফল। এর ইংরেজি নাম Pomelo (pummelo ev pommelo)। এর বৈজ্ঞানিক নাম Citrus maxima বা Citrus grandis। বিভিন্ন ভাষায় এটি পমেলো, জাবং, শ্যাডক ইত্যাদি নামে পরিচিত। কাঁচা ফলের বাইরের দিকটা সবুজ এবং পাকলে হালকা সবুজ বা হলুদ রঙের হয়। এর ভেতরের কোয়াগুলো সাদা বা গোলাপী রঙের। এর খোসা বেশ পুরু এবং খোসার ভিতর দিকটা ফোম এর মত নরম। লেবু জাতীয় ফলের মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড় যা ১৫-২৫ সেমি ব্যাসবিশিষ্ট হয়ে থাকে। এর ওজন ১-২ কেজি হয়। এর আদিভূমি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যযোগ্য জাম্বুরায় রয়েছে খাদ্যশক্তি ৩৮ কিলোক্যালরি। প্রোটিন ০.৫ গ্রাম। স্নেহ ০.৩ গ্রাম। শর্করা ৮.৫ গ্রাম। খাদ্যআঁশ ১ গ্রাম। থায়ামিন ০.০৩৪ মিলিগ্রাম। খনিজ লবণ ০.২০ গ্রাম। রিবোফ্লেভিন ০.০২৭ মিলিগ্রাম। নিয়াসিন ০.২২ মিলিগ্রাম। ভিটামিন বি২ ০.০৪ মিলিগ্রাম। ভিটামিন বি৬ ০.০৩৬ মিলিগ্রাম। ভিটামিন সি ১০৫ মিলিগ্রাম। ক্যারোটিন ১২০ মাইক্রোগ্রাম। আয়রন ০.২ মিলিগ্রাম। ক্যালসিয়াম ৩৭ মিলিগ্রাম। ম্যাগনেসিয়াম ৬ মিলিগ্রাম। ম্যাংগানিজ ০.০১৭ মিলিগ্রাম। ফসফরাস ১৭ মিলিগ্রাম। পটাশিয়াম ২১৬ মিলিগ্রাম। সোডিয়াম ১ মিলিগ্রাম। জাম্বুরা একটি ভিটামিন সমৃদ্ধ ফল। এর পুষ্টিমান অনেক উন্নত।

জাম্বুরা ঠান্ডা, সর্দি-জ্বর জনিত সমস্যার জন্য খেলে ভাল ফলাফল পাওয়া যায়। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। জাম্বুরাতে বিদ্যমান বায়োফ্লভনয়েড বেশি থাকায় ব্রেস্ট ক্যান্সারের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। ভিটামিন ‘সি’ বেশি থাকায় রক্তনালির সংকোচন-প্রসারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ডায়াবেটিস, জ্বর, নিদ্রাহীনতা, মুখের ভেতরে ঘা, পাকস্থলী ও অগ্ন্যাশয়ের বিভিন্ন রোগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করে, সেই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের হৃদরোগের হাত থেকে রক্ষা করে। নিয়মিত জাম্বুরা খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয় ও পেটের নানা রকম হজমজনিত সমস্যার প্রতিকার হয়।’

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.