সাম্প্রতিক পোস্ট

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জিওইঞ্জিনিয়ারিং কতটা যৌক্তিক

সিলভানুস লামিন

ভূমিকা
জলবায়ু পরিবর্তন যে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমস্যা তা নিয়ে বিশ্বে খুব মানুষই পাওয়া যাবে যারা দ্বিমত পোষণ করবেন। বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তাই তো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী নানান কর্মসূচি চোখে পড়েছে।Climate change কেউ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই পরিবর্তন মোকাবিলা করতে চান, কেউ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণগুলো চিহ্নিত করে সে কারণগুলো যাতে অধিকহারে সংঘটিত না হয় তা নিয়ে বিভিন্নভাবে উদ্যোগী হয়েছেন আবার কেউ কেউ জলবায়ু পরিবর্তনকে একটি প্রাকৃতিক কারণ হিসেবে মেনে নিয়ে এর সাথে অভিযোজন করার বিভিন্ন উদ্যোগ উদ্ভাবন করেছেন। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, শিল্পোন্নত দেশগুলোর কর্তাব্যক্তিরা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপরই গুরুত্বারোপ করেছেন। বেশ সম্প্রতি ব্রিটেনের বিজ্ঞানীরা উষ্ণতা প্রশমনে আবারও স্ট্র্যাটোসফিয়ারে সালফার খন্ড বিস্ফোরণের পরিকল্পনা করছেন। তাই স্বাভাবিকভাবে এটি অনুমেয় যে, কোন প্রাকৃতিক ঘটনাকে পরিবর্তন, মোকাবিলা বা এই প্রাকৃতিক ঘটনার সংঘটনের হারকে রোধ করার জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে সেটি অবধারিতভাবেই আরেকটি ঘটনার সূত্রপাত ঘটাবে। কারণ, কোন প্রাকৃতিক ঘটনার স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করা হলে সেই প্রাকৃতিক ঘটনা প্রতিক্রিয়া দেখাবেই। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য শিল্প ও প্রযুক্তিতে উন্নত দেশগুলোর বিজ্ঞানীরা নানানভাবে এবং বিভিন্ন সময়ে বায়ুম-লের ওজন স্তরকে পরিবর্তন করেছেন; এখনও যে করছেন তার উদাহরণ ব্রিটেনের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এই পরিকল্পনাই জ্বলন্ত প্রমাণ। পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়াকে তারা ‘জিওইঞ্জিনিয়ারিং’ বলেছেন। সোজা কথায়, জিওইঞ্জিনিয়ারিং হচ্ছে- বায়ুমন্ডলের ওজন স্তরকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিবর্তন (Modification) করার মাধ্যমে জলবায়ুর পরিবর্তন রোধ করা।

জিওইঞ্জিনিয়ারিং কি?
আসলে জিওইঞ্জিনিয়ারিং হচ্ছে একটি প্রক্রিয়া। বায়ুমন্ডলের ওজন স্তরকে নিয়ন্ত্রণ বা পরিবর্তন করার মধ্য দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করাই হচ্ছে জিওইঞ্জিনিয়ারিং। এই প্রত্যয়টি খুব বেশি নতুন নয়। আনুমানিক ১৯৪০ সাল থেকে বিজ্ঞানীরা এই প্রত্যয়টি ব্যবহার করেছেন। তারা এই প্রত্যয়টি ব্যবহার করেই নানাভাবে বিশ্বব্রহ্মা-কে পরিবর্তন করার প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো, পৃথিবীকে আরও বাসযোগ্য করে তোলা। যদিও এই কৃত্রিম পরিবর্তনের পরিণতি কোনভাবেই আমজনতার উপকার আসেনি; এসেছে নানান অপ্রত্যাশিত দূর্যোগ। তাই তারা যখন সূর্য রশ্মির প্রখরতা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য স্ট্র্যাটোসফিয়ারে সালফারের খন্ড বিস্ফোরণ করান অথবা Genetically Engineered খাদ্য-শস্যের ডিএনএ’র মাধ্যমে জেনেটিক বৈচিত্র্যকে দূষিত করেন তখন তারা বিশ্বকে জিওইঞ্জিনিয়ারিং করছেন, আবার সমুদ্রের উপরিভাগে আয়রন খন্ড ভাসিয়ে কৃত্রিমভাবে ফাইটোপ্লাংকটন উৎপন্ন করান কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করার জন্য তখনও তারা বিশ্বকে জিওইঞ্জিনিয়ারিং করছেন। অন্যদিকে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টি সংঘটনের জন্য যখন তাঁরা মেঘে ইনজেকশনের মাধমে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের বিষ্ফোরণ ঘটান কিংবা পরামাণবিক পাওয়ার প্লান্ট সূচনা করেন তখনও তারা বিশ্বকে জিওইঞ্জিনিয়ারিং করছেন। এমনকি, আমরা যখন আমাদের চারদিকের বনজঙ্গল উজাড় করি, বৃক্ষ নিধন করি, প্রান্তিক জমির অতিরিক্ত ব্যবহার করি, বিশুদ্ধ পানির উৎসগুলোকে দূষিত ও নিশ্চিহ্ন করি, প্রতিবেশ ধবংস করি তখন আমরাও পৃথিবী নামক এই গ্রহকে জিওইঞ্জিনিয়ারিং করি।

স্ট্র্যাটোসফিয়ারে সালফার অংশ নিক্ষেপ: আবারও বিশ্বকে জিওইঞ্জিনিয়ারিং
জিওইঞ্জিনিয়ারিং এর অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাস করার জন্য বায়ুমন্ডলের স্ট্র্যাটোসফিয়ারে সালফার অংশ নিক্ষেপ করার পরিকল্পনা করেছিলেন বেশ ক’বছর ধরে। তারা একটি বিশালাকৃতির গ্যাস বেলুনের মাধ্যমে আকাশে একটি বিশেষ ধরনের কিলোমিটার দীর্ঘ নল প্রেরণ করার চিন্তাভাবনা করেছিলেন। এই প্রক্রিয়ায় তাঁরা বিশালাকৃতির গ্যাস বেলুন এই দীর্ঘ নলটি আকাশে উড়াবেন এবং এই নল থেকে ক্রমাগতভাবে সালফারের খ- স্ট্র্যাটোসফিয়ারে নিক্ষেপ করার পরিকল্পনা করেছিলেন । এই সালফারের অংশ পৃথিবীর ওপর সূর্যরশ্মির সরাসরি বিকিরণ বাধাগ্রস্ত করবে বলে তারা সেই সময় জানান। এতে করে সূর্যেরশ্মির প্রখরতা কিছুটা হলেও কমবে, যা বিশ্ব উষ্ণতা হ্রাস করবে বলে তাঁরা মনে করেন।

উপসংহার
সাধারণত উপরে (আকাশে) যা কিছুই ছুড়ে দেওয়া হোক না কেন সেগুলো অবশেষে পুনরায় জমিনে পড়ে যায়। সেটা সিলভার আয়োডাইডই হোক, আবার সালফার বা লবণই হোক। তাই স্ট্র্যাটোসফিয়ারে এই রাসায়নিক পদার্থগুলোর যেসব খন্ড নিয়ে বিষ্ফোরিত করা হবে অবশেষে সেগুলো পুনরায় এই জমিনে পড়বে। দূষিত করবে এই জমিনকে। এই ইস্যুটি পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ২০১১ সালের তথ্যমতে, বিশ্বে প্রতিবছর শিল্পকারখানা ও যন্ত্রযান থেকে নির্গত দূষিত ধোঁয়ার কারণে প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন লোক মারা যায়। ২০১৭ তে এসে নিশ্চয়ই এ মৃত্যুর হার আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। কেননা এ সময় বিশ্বব্রহ্মা-কে নানানভাবে ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছে। তাই বলা যায়, পৃথিবীকে যদি বার বার জিওইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আওতায় নিয়ে আসা হয় তাহলে এর পরিণতি কোনভাবেই পৃথিবীর মানুষের জন্য সুখকর হবে না। কেননা, জিওইঞ্জিনিয়ারিং এর উপাদানগুলো দূষিত পদার্থ হিসেবে আরও বেশি করে পৃথিবীর বুকে সংরক্ষিত হবে এবং বায়ু দূষণ সংক্রান্ত সম্ভাবনাকে আরও জটিলতর করে তুলবে।

happy wheels 2
%d bloggers like this: