Posted in

নির্মল হই, মানবিক হই

সিলভানুস লামিন

এক
বলা হয়, মানুষের জন্ম হয় মৃত্যুর জন্য! শুধু মানুষের বেলায় এটি প্রযোজ্য নয়। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীতে যত প্রাণ আছে তাদের বেলায়ও এটি প্রযোজ্য। এটি চিরন্তন সত্য যে, একবার জন্ম নিলে তাকে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতেই হবে। সেটি মানুষই হোক বা অন্য কোন প্রাণীই হোক। বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার জন্য আমরা মানুষেরা সেটা বুঝি ও জানি। আমরা মানুষেরা এই পৃথিবীতে অনেক বছর বাঁচতে চাই। তাই তো মানুষের শরীরে যাতে কোন রোগ বাসা বাঁধতে না পারে সেজন্য নানান ধরনের ওষুধপত্র আবিষ্কার করেছে মানুষ নিজে। মৃত্যুকে কম বেশি সব মানুষই ভয় পায়। আসলে মৃত্যু শব্দটি শোনার সাথে সাথে আমাদের সবার শরীরে হিমশীতল বাতাস বয়ে যায়! তবে আমরা যারা ধর্মকর্ম করি, আমরা মনে করি মৃত্যুর পরও আরেকটি জীবন আছে। অনেকের ভাষায় সেটি ‘অনন্ত জীবন’। ‘অনন্ত জীবনে’ কোন মৃত্যু নেই। তাই আমরা যার যার মতো করে নিজেদের ধর্মকর্ম করি! কারণ আমরা ‘অনন্ত জীবনের’ বিশ্বাস করি। আমরা কৃপা ও আর্শীবাদিত হতে চাই, হতে চাই পরিশুদ্ধ, নির্মল ও ভালো মানুষ। যাতে করে মৃত্যুর পর অনন্ত জীবন লাভ করি। আমরা যারা ধর্ম বিশ্বাসী, আমরা মনে করি পৃথিবীর পর স্বর্গ আছে। কিন্তু যারা ধর্ম বিশ্বাসী নয় তারা প্রশ্ন করেন সৃষ্টিকর্তা আদৌ আছেন কিনা। বলা হয় যে, পৃথিবীতে দু’ধরনের বাস্তবতা আছে; একটি হলো বিজ্ঞান এবং অপরটি হলো বিশ্বাস। বিজ্ঞান চায় প্রমাণ-যেমনটি ধর্ম অবিশ্বাসীরা প্রশ্ন করেন ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে; তারা তাকে দেখার পর বিশ্বাস করবেন। অন্যদিকে বিশ্বাসকে আমরা প্রমাণ দিয়ে দেখাতে পারি না; বিশ্বাসের অস্তিত্ব থাকে আমাদের হৃদয়-মনে। আমরা বিশ্বাস করি সৃষ্টিকর্তা আছেন, স্বর্গ আছে। এই বিশ্বাসকে সঙ্গী করেই আমরা ধর্মকর্ম করি! সৃষ্টিকর্তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করি। যাতে আমরা সেই অনন্ত জীবন লাভ করতে পারি।

দুই
বিশ্বের প্রতিটি ধর্মই মানুষকে সুপথে পরিচালনা করে। মানুষকে মানবিক করে তোলে। প্রতিটি ধর্মই মানুষকে ভালো মানুষ হতে বলে। তাই আমরা সত্যিই যদি ধার্মিক হই তাহলে আমাদের জীবন সুন্দর হবে, পরিবারে থাকবে শান্তি। প্রতিদিন ধর্মকর্ম করার পরও আমরা যখন অন্যের সমালোচনা করি, ক্ষতি করার চিন্তা করি, পরচর্চা করি বা অন্যদের ঈর্ষা করি কিংবা পরিবারের সদস্যদের গালিগালাজ করি তখনআমাদের ধর্ম কর্ম করার কোন কাজে আসবে না। মসজিদ, মন্দির বা গির্জা হচ্ছে আমাদের হৃদয়! অন্যদিকে পরিবারে যখন আমরা অন্যকে গালিগালাজ করি তখন অজান্তে আমরা আমাদের শিশু সন্তানদেরকে কুপথে পরিচালনা করি। কারণ শিশুদের প্রথম সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয় তার পরিবার থেকে। সে বাবা বা মায়ের কাছে অনেক কিছু শেখে। আমার পরিবারে যদি শান্তি থাকে তাহলে আমার পরিবারের সন্তানটির সামাজিকীকরণও শান্তি প্রক্রিয়ায় হয়। একবার একটি গ্রামে যাওয়ার সুযোগ হয় আমার। একটি সুন্দর দু’বছরের মেয়েকে দেখে ভালো লাগলো, শিশু মেয়েটি খুব সুন্দর করে কথা বলে। শিশু মেয়ের মায়ের কাছে জানতে চেয়েছি মেয়ে এত সুন্দর কথা বলে কী করে? মায়ের উত্তর গর্বভরে আসে “সে শুধু সুন্দর কথাই বলেই না গালিও দিতে শিখেছে”! গালিটা কার কাছ থেকে শিখেছে? শিশুটির মা অবশ্য সেটি বলেননি। শিশুটি গালি দিতে শিখেছে দেখে মায়ের গর্বের শেষ নেই! কিন্তু শিশুর এই গালি দেওয়ার শিক্ষাটিই তো অন্যকে বলে দেয় যে, পরিবারের কর্তাকত্রীরা পরস্পরকে গালি দেয়! তাই মনকে পরিশুদ্ধ করে রাখতে হবে। মন পরিশুদ্ধ হলে আমরা আমাদের সীমাবদ্ধতার মাঝেও ভালো কাজ, উন্নয়নমূলক কাজ করতে পারি যেটা মানবজাতিরই শুধু নয়; পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টিরই কাজে আসবে। ভালো কাজ করলে, উপকার করলে নিজেদের ভেতরে এক ধরনের প্রশান্তিও উপলদ্ধি করা যায়।

তিন
জীবন পরিচালনা করতে গিয়ে অনেককিছুই দেখেছি, উপলদ্ধি করেছি! জীবনের অর্থ খুঁজে বের করার চেষ্টা করি নিরন্তরভাবে। জীবনঅভিজ্ঞতা থেকে আমি দেখেছি ধর্ম হচ্ছে একটি পদ্ধতি, একটি পথ, একটি অবলম্বন, যা মানুষের ভেতরে মানবিক গুণাবলী সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। ধর্ম মানুষকে পথ দেখিয়ে দেয় সে কীভাবে ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। পৃথিবীর সব ধর্মকে তাই শ্রদ্ধা করতে হবে, সব ধর্মই মানুষকে সঠিক পথে চলতে বলে। সব ধর্মই মানুষকে মানবিক করে তুলতে সহায়তা করে। এককথায় বলা যায়, মানবতাই হচ্ছে সবচে’ বড় ধর্ম। তাইতো রবি ঠাকুর বলেছেন, “এমন জীবন তুমি কর গঠন মরনে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভূবন”! কেন বলেছেন এমন কথা? কারণ আমরা মানুষেরা যদি ভালো পথে চলি, সুন্দর পথে চলি, মানুষের মঙ্গল করি তাহলে আমাদের প্রস্থানে জগত তথা মানুষ কাঁদবেই কাঁদবে। মাদার তেরেজাসহ অন্যান্য ভালো মানুষের প্রস্থানের সময় এমনকি এখনও অনেক মানুষ তাদের জন্য কাঁদে। কীভাবে সম্ভব এমন জীবন গঠন করার? সোজা উত্তর হলো-সঠিকভাবে ধর্মকর্র্ম করা, নির্মল, পরিশুদ্ধ ও মানবিক হওয়া। প্রকৃতপক্ষে, মরনের সময় আমাদের হাসতেই হবে! কারণ জন্মের সময় তো আমরা কেঁদেছি আর জগত আমাদের পেয়ে হেসেছিল। মরনের সময় আসুন না আমরা হাসার চেষ্টা করি, আর জগতটা আমাদের জন্য হু হু করে কাঁদুক! আমরা কী পারবো মরনের অন্তিম সময়ে হাসতে? অবশ্যই পারবো যদি আমরা ভালো মানুষ হই, পরিশুদ্ধ ও নির্মল মানুষ হই এবং আমরা যদি ধার্মিক মানুষ হই, সত্যিকার অর্থেই ধার্মিক মানুষ!

চার
আমার মনে আছে, দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় কোন এক পোকার জীবনচক্র নিয়ে জীববিজ্ঞানের একটি বইয়ে পড়েছিলাম। সেই পোকার নারী সদস্যটির জীবনচক্রটা হচ্ছে এরকম, সকালে জন্ম, দুুপুরে বিবাহ এবং সন্ধ্যায় সন্তান প্রসবের মাধ্যমেই জগত থেকে প্রস্থান করে। আমাদের মানুষের দৃষ্টিতে সেটি মাত্র কয়েক ঘণ্টার সময়! কিন্তু হয়তো সেই নারী পোকার হিসাবে সেটি ৫০ বা ৬০ বছর! এই উদারহণটি ব্যবহারের কারণটা হচ্ছে, স্বাভাবিক হিসাবে আমাদের মানুষের গড় আয়ু ৬০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে কিন্তু সৃষ্টিকর্তার সেই ‘মহাকালের’ হিসাবে হয়তোবা সেটি সেকেণ্ডের ভগ্নাংশ মাত্র! তাহলে কেন পৃথিবীতে আমরা অশান্তি সৃষ্টি করবো? কী লাভ এতো অহংবোধ, এত সম্পদের পাহাড় গড়ার? কী লাভ মানুষের ক্ষতি করার, খুন করার, হিংসা করার কিংবা নিন্দা করার? একদিন না একদিন তো মৃত্যুকে আলিঙ্গনই করতে হয়। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার মধ্য দিয়ে এই পৃথিবীর মানচিত্র থেকে আমাদের সবার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে, বেঁচে থাকা অন্যান্য মানুষের কাছে আমরা তো কেবল ইতিহাস হয়ে থাকবো! তাহলে আসুন না আমরা সত্যিকারের ধার্মিক মানুষ হই, মানবিক হই। আমরা যদি ধার্মিক, মানবিক হই এবং নির্মল ও পরিশুদ্ধ হই তাহলে তো মৃত্যুর পর সেই কাঙ্খিত ‘অনন্ত জীবন’ লাভ করবো, যে জীবনে কোন মৃত্যু নেই। আর ধার্মিক হলে, ভালো মানুষ হলে, মানবিক হলে এই ইহজগতের মানুষের কাছেও আমরা সন্মানিত হয়ে থাকবো, তাঁরা আমাদেরকে আজীবন স্মরণ করবে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.