সাম্প্রতিক পোস্ট

পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিম গাছ

নেত্রকোনা থেকে রুখসানা রুমী

আমাদের গ্রামীণ নারীরা বাড়ির চারপাশে বেড়ে ওঠা কুড়িয়ে পাওয়া অচাষকৃত বনজ শাকসবজি সংগ্রহ করে পরিবারের খাদ্য ও বিভিন্ন রোগের প্রাথমিক চিকিৎসার একটি বড় অংশ পূরণ করে থাকে। গ্রামীণ নারীদের নিরাপদ খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার এই উদ্যোগকে আধুনিক সমাজের বর্তমান প্রজন্ম খুব একটা মূল্যায়ন করে না। এসব খাদ্য ও ঔষধি উদ্ভিদ গ্রামীণ সংস্কৃতি ধারণ করে আসছে যুগের পর যুগ ধরে তাদের বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহারের মাধ্যমে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত কল্পে দেশের পরিবেশ সংরক্ষণে, জনগোষ্ঠীর পুষ্টির চাহিদা পূরণে, কাঠের চাহিদা পূরণে, স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভেষজ ও বনজ ফলজ বৃক্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। দিন দিন আমাদের দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কমছে প্রাকৃতিক বন ও জলাশয়, হ্রাস পাচ্ছে কৃষি জমির। অধিক জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন অধিক খাদ্যের। আর এ অধিক খাদ্য উৎপাদনে প্রাকৃতিক বন কেটে ধ্বংস করে এবং জলাশয়গুলো ভরাট করে ও জলাশয়গুলোতে জন্মানো স্থানীয় মাছ ও খাদ্য উদ্ভিদগুলো রাসায়নিক উপকরণের মাধ্যমে ধ্বংস করে চাষ করা হচ্ছে উন্নত ও হাইব্রিড ফসল ও হাইব্রিড মাছ। ফলে আমাদের অজান্তেই হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের এসব প্রাকৃতিক সম্পদ, আমরা বঞ্চিত হচ্ছি নিরাপদ ও সুস্বাদু খাদ্য থেকে। আমরা যতই প্রকৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছি, ততই আমাদের প্রাণের ঝুঁকি বাড়ছে, কমছে নিরাপদ খাদ্য, বাড়ছে মানুষসহ সকল প্রাণের স্বাস্থ্য ঝুঁকি। বাজার ছাড়া এখন আমাদের বেঁচে থাকা কল্পনাও করা যায় না। বাজার নির্ভরশীলতা বৃদ্ধির সাথে সাথে দ্রুত গতিতে কমছে প্রাকৃতিক সম্পদে মানুষের অভিগম্যতা, কমছে মানুষে মানুষে এবং মানুষের সাথে প্রাণ ও প্রকৃতির পারষ্পারিক আন্তঃনির্ভরশীলতা এবং বৃদ্ধি পাচ্ছে পারস্পারিক সম্পর্কহীনতা।

20190617_145241-W600

দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় নেত্রকোনা অঞ্চলেও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সমারোহ। তৈরি হচ্ছে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। সভ্যতার উন্নয়নের নামে মানব জাতির প্রকৃতি বিধ্বংসী কাজের ফলে প্রকৃতি দ্রুত বিধ্বস্ত হচ্ছে, মানুষ দিন দিন প্রকৃতির প্রতি বিমাতাসূলভ আচরণ করছে, তাই প্রকৃতিও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে মানুষের দিক থেকে। যার ফলশ্রুতিতে প্রকৃতি মাঝে মাঝেই বিরূপ আচরণ করছে। যা পরিবেশের জন্যে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনছে। সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ জীবনের জন্য চাই সুন্দর পরিবেশ। আর এই পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের এবং আমাদের প্রয়োজনেই পরিবেশকে রক্ষায় আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে। ‘আমাদের পরিবেশ আমরাই রক্ষা করব’ এই মন্ত্রে উজ্জীবীত হয়ে নেত্রকোনা জেলার কেন্দয়া উপজেলার আশুজিয়া ইউনিয়নের নগুয়া গ্রামের ‘সবুজ শ্যমল কৃষক সংগঠনে’র কৃষক-কৃষাণীরা চলতি মৌসুমেও নিম বৃক্ষের চারা রোপণের উদ্যোগ নিয়েছে।

নতুন প্রজন্মদের সাথে প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ, গ্রামীণ সংস্কৃতি, পরিবেশ সুরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধানে উদ্যোগ গ্রহণ এবং প্রকৃতির সাথে মানুষের সর্ম্পক উন্নয়নে সংগঠনের সদস্যরা নানাভাবে বিভিন্ন সময় নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করে আসছে। নগুয়া গ্রামটিকে নিম গ্রাম হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সবুজ শ্যামল কৃষক সংগঠনটি প্রতিবছর বৃক্ষ রোপণের মৌসুমে গ্রামের রাস্তার পাশে নিম গাছের চারা রোপণ করে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় এ বছরও বিশ্ব পরিবেশ দিবসকে সামনে রেখে সংগঠনের উদ্যোগে এবং বারসিক’র সহয়তায় গ্রামের আরও এক কিলোমিটার রাস্তার দুই পাশে ১০০টি নিমের চারা রোপণ করেছেন স্থানীয়রা। বিগত দুই বছরসহ নগুয়া গ্রামের রাস্তার পাশে এ পর্যন্ত মোট মোট ৩০০টি নিম গাছের চারা রোপণ করা হল। গ্রামের পুরনো লোকেদের মূখে প্রায়শই শোনা যায় যে, বাড়ির চারপাশে নিম গাছ থাকলে শতকরা আশি ভাগ বিভিন্ন রোগবালাই থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

পুরনো লোকেদের এধরণের কথা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়েই সংগঠনটি এই উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান সংগঠনের সভাপতি রাখাল চন্দ্র দাস। তিনি বলেন,‘নিম গাছ বাতাস দূষণমুক্ত করে। এছাড়াও নিমের পাতা ও ডাল মানুষসহ সকল গৃহপালিত পশু-পাখির বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। নিমের ফল পাখির প্রিয় খাবার।’ নিম চারা ছাড়াও সংগঠনের সদস্যরা প্রত্যেকে নিজ নিজ বাড়ির চারপাশে প্রতি মৌসুমে বৈচিত্র্যময় স্থানীয় জাতের ফলের চারা রোপণ করে থাকেন। এবছরও তার কোন হেরফের হয়নি। রাখাল চন্দ্র দাস বলেন, ‘আগামীতেও আমরা সংগঠনের উদ্যোগে গ্রামের অন্যান্য রাস্তার পাশে নিমের চারা রোপণ করবো। নিমের চারা রক্ষণাবেক্ষণ করে সংগঠনের সদস্যরাই। এছাড়া গ্রামের যার বাড়ির সামনে বা জমির পাশে রাস্তায় চারা রোপণ করা হয়েছে সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ঐ জমির মালিকরা পালন করে থাকেন।’

20190617_145308-W600

গ্রামের প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও বৃদ্ধি, মানুষে-মানুষে এবং মানুষ ও প্রকৃতির পারষ্পারিক আন্তঃনির্ভশীলতা বাড়াতে গ্রামীণ এ জনসংগঠনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যেসমৃদ্ধ সমাজ গড়তে প্রয়োজন প্রাণবৈচিত্র্যের, কেননা আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির অধিকাংশের উপকরণই যোগান দিয়ে থাকে প্রকৃতি। তাই শুধু নগুয়া গ্রামই নয় এবং শুধু সবুজ শ্যামল কৃষক সংগঠনের উদ্যোগেই নয়, দেশের সকল গ্রামের সকল জনসংগঠন বা সকল পরিবারেরই উচিত অন্তত একটি করে নিমের চারা রোপণ করা। তাই আসুন আমরা সকলে সংকল্পবদ্ধ হই নিজ নিজ বাড়ির পাশে বা গ্রামের রাস্তা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের খালি পতিত পড়ে থাকা স্থানে বাতাসের প্রাকৃতিক ছাকনি (ফিল্টার) এই নিমের চারা রোপণ করে পরিবেশ সুন্দর করি ও প্রাণীকূলের বেঁচে থাকার অন্যতম উপাদান বাতাসকে দূষণমুক্ত রাখি।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: