Posted in

ধানের বাকানী রোগ: প্রতিকারের উপায় জানতে চান কৃষকরা

নেত্রকোনা থেকে শংকর ম্রং

ধান বাংলাদেশের অন্যতম ফসল। ধান চাষ হয় না এমন এলাকা দেশে খুঁজে পাওয়া দুস্কর। কিন্তু ধান চাষ করতে গিয়ে প্রাকৃতিক ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিভিন্ন সমস্যা মোকাবেলা করতে হয় আমাদের কৃষকদের। কৃষিতে অতিমাত্রায় রাসায়নিক উপকরণ ব্যবহার এবং জলবায়ুজনিত ও প্রাকৃতিক কারণে প্রতিবছর আমাদের উৎপাদিত ফসল বিভিন্ন ধরণের রোগ দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে, যার ফলে ধান ফসলের ফলন আশংকাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। ফলে ধান ফসল উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকরা ধান চাষ করে তেমন লাভবান হতে পারছেন না। বরং প্রতিবছর ধান চাষ করে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশে এ পর্যন্ত মোট ৩২টি ধান ফসলের রোগ-বালাই নির্ণয় করেছেন।

IMG_20190929_104819-W600
বাকানী রোগটি মূলত বীজ বাহিত রোগ। মাটি, পানি ও বাতাসের মাধ্যমেও এ রোগটি এক জমি থেকে অন্য জমিতে ছড়ায়। জমিতে আগে থেকে এ রোগের জীবাণু থেকে থাকলেও এ রোগটি হয়। অতিরিক্ত ইউরিয়া সারের ব্যবহার এবং তাপমাত্রা বেশি হলেও এ রোগের প্রার্দুভাব বৃদ্ধি পায়। ফিউজারিয়াম মোনিলিফরমি (Fusarium moniliforme) নামক ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে। এ ছত্রাক জিবেরিলিন নামক এক ধরণের হরমোন নিঃসরণ করার ফলে গাছের দ্রুত অঙ্গজ বৃদ্ধি ঘটে। বাকানী রোগের ফলে শতকরা ৩০ ভাগ পর্যন্ত ফসল হ্রাস পায়। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে ক্ষেতের সমস্ত ফসল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আমন মৌসুমে ধান ফসলে সাধারণত যেসব রোগ-বালাই দেখা যায় তার মধ্যে মাজরা পোকার আক্রমণ, পাতা মোড়ানো পোকা, গোড়া পচাঁ ও বাকানী রোগ উল্লেখযোগ্য। নেত্রকোনা অঞ্চলের চলতি আমন মৌসুমে ধানের ক্ষেত পর্যবেক্ষণ করে অনেক জমিতেই ধানের পাতা মোড়ানো পোকা এবং বাকানী রোগের আক্রমণ দেখা যায়। বিশেষভাবে ব্রি-৩২ জাতের ধানে বাকানী রোগের আক্রমণ বেশি বলে কৃষকসূত্রে জানা যায় (সূত্র: বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট)।

IMG_20190929_105156-W600
এ রোগটি ধান গাছের চারা অবস্থা থেকে ধানের থোর আসা পর্যন্ত যে কোন সময় হতে পারে। তবে চারা অবস্থায় এবং জমিতে রোপণের পর চারা বৃদ্ধির সময়কালে এ রোগটি বেশি হয়ে থাকে। বাকানী আক্রান্ত ধানের চারা সাধারণ ধানের চারার চেয়ে দ্বিগুণ লম্বা হয়ে ফ্যাকাসে হয়ে যায়। আক্রান্ত চারার পাতা হালকা সবুজ রঙের চিকন লিকলিকে ও দুর্বল হয় এবং গাছের গোড়ার দিকের গিট থেকে শিকড় বের হয়ে থাকে, গাছের গোড়া পঁচে যায় এবং ধীরে ধীরে আক্রান্ত গাছ শুকিয়ে মরে যায়। আক্রান্ত গাছে কোন ফলন হয় না। ধানের গর্ভাবস্থায় এ রোগ হলে চিটা ও অপুষ্ট ধান বেশি হয়।

কৃষকদের বক্তব্য
নেত্রকোনা জেলার ল²ীগঞ্জ ইউনিয়নের কান্দাপাড়া গ্রামের কৃষক কাশেম মিয়াসহ বেশ কয়েকজন কৃষক তাদের চাষকৃত ব্রি-৩২ ধানের জমি থেকে বাকানী আক্রান্ত ধান গাছ তুলছিলেন। কৃষক কাশেম মিয়াকে এ ধরণের ধান গাছ তুলে ফেলার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘এধানগুলো ডিগ উঠা রোগে (বাকানী) আক্রান্ত হয়েছে। এ থেকে কোন ধান হবে না, এগুলো ক্ষেতে থাকলে ক্ষেত দেখতে অসুন্দর দেখায় এবং বেশি খাবার খায়, ফলে সাধারণ ধান গাছগুলো খাবার না পেয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে।’ বীজ তিনি নিজে রেখেছেন নাকি অন্য কোথাও থেকে সংগ্রহ করেছেন জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বাজার থেকে প্যাকেটের বীজ (বিএডিসি) কিনে রোপণ করেছেন বলে জানান। তিনি আরও জানান, এলাকার যে সকল কৃষক ব্রি-৩২ ধানের বীজ নিজেরা সংগ্রহ করে রোপণ করেছেন তাদের জমিতে বাকানী রোগটি হয়নি, তবে যারাই বাজার থেকে প্যাকেটের বীজ ক্রয় করে রোপণ করেছেন শুধু তাদের জমিতেই এ রোগটি হয়েছে। এ রোগের কারণ হিসেবে কৃষক কাশেম মিয়া বলেন, ‘দিগ উঠা/বাকানী রোগটি বীজতলা থেকে চারা তোলার সময় চারার গোড়ায় ছিড়ে গেলে এবং সেই গোড়া ছিড়ে যাওয়া চারাগুলো রোপণ করলে এ রোগটি হয়। তবে ব্রি-৪৯ সহ অন্যান্য ধানে (উফশী ও স্থানীয় জাতে) এ রোগ দেখা যায় নাই।’

বাকানী রোগের প্রতিকার

যে জমিতে বাকানী রোগটি হয়েছে সে জমিতে পরবর্তী মৌসুমে বাকানী রোগ সহনশীল ধানের জাত চাষ করতে হবে। সুস্থ বীজ ব্যবহার করতে হবে এবং বীজতলায় বীজ বপনের আগে বীজ ছত্রাকনাশক দিয়ে শোধন করে নিলে ভালো হয়। বীজতলায় এ রোগের আক্রমণ দেখা গেলেই রোগাক্রান্ত চারা বেছে পুড়িয়ে দিতে/ধ্বংস করতে হবে। বিশেষভাবে ধান গাছে ফুল আসার আগেই তুলে ফেলতে হবে। ইউরিয়ার অতিমাত্রায় ব্যবহার বন্ধ করে সুষমমাত্রায় ইউরিয়া ব্যবহার করেও এ রোগের আক্রমণ হ্রাস করা যায়।

IMG_20190929_105835-W600

নেত্রকোনা অঞ্চলের কৃষকদের নিকট ব্রি-৩২ ধানের জাতটি খুবই জনপ্রিয়। অপেক্ষাকৃত আগাম কাটা যায় এবং ফলনও মোটামুটি ভালো হওয়ায় নেত্রকোনার অধিকাংশ কৃষকরাই ব্রি-৩২ জাতের ধান চাষ করে থাকেন। রাস্তার দু’পাশে যেসব জমিতে বাকানী রোগ দেখা যায় তার প্রায় সবগুলোই ব্রি-৩২ জাত। চলতি আমন মৌসুমে যেসকল কৃষকরা বাজার থেকে প্যাকেটের বীজ কিনে ব্রি-৩২ জাতের ধান চাষ করেছেন তাদের অধিকাংশের ক্ষেতেই এ রোগের আক্রমণ দেখা গেছে। আবার যেসকল কৃষক নিজেদের সংরক্ষিত ব্রি-৩২ জাতের বীজ দিয়ে চাষ করেছেন তাদের ক্ষেতে এ রোগের আক্রমণ হয়নি। তাই এলাকার কৃষকরা নিজেদের সংরক্ষিত বীজের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে পেরে আগামী মৌসুমের জন্য রোগমুক্ত ভালো বীজ নিজেরাই সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

 

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.