সাম্প্রতিক পোস্ট

পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চায় নেত্রকোনার রোকেয়া আক্তার

নেত্রকোনা থেকে রুখসানা রুমী

বাংলার গ্রামেগঞ্জে এখনও অনেক কৃষক-কৃষাণী দেখা যায়, যারা বসতভিটায় সবজি চাষ করে পরবর্তী মৌসুমের জন্য সেসব সবজির বীজ নিজে সংরক্ষণ করে এবং গ্রামের অন্যদের মধ্যেও বিতরণ করেন। ফসল উৎপাদনের অন্যতম উপকরণ হলো বীজ। কথায় আছে ‘সভ্যতার ভিত্তি কৃষি, আর কৃষির ভিত্তি হল বীজ’। সুস্থ সবল বীজ থেকেই ভালো ফসল উৎপাদিত হয়। গ্রামের অনেক কৃষক-কৃষাণী রয়েছেন যারা বসতভিটার সামান্য জমিতে বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ করে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণ ও উদ্বৃত্ত¡ সবজি বিক্রি করে সংসারের খরচ বহন করেন। আবার এমনও কিছু কৃষক-কৃষাণী রয়েছেন যাদের বসতভিটায় অনেক পতিত জায়গা থাকা সত্তে¡ও তারা কখনো সেসব বসতভিটায় চাষাবাদ করেন না। কিন্তু যেসব কৃষক বা কৃষাণীদের ইচ্ছে রয়েছে অথচ জমি নেই তারা এসসব পতিত বসতভিটার জমি দেখে প্রতিনিয়ত আফসোস করেন এবং এমন জমি পাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু সামর্থ্য না থাকায় তারা জমি ক্রয় বা লিজ গ্রহণ করতে পারেনা।


নেত্রকেনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলায় আশুজিয়া ইউনিয়নের নগুয়া গ্রামের এমনই একজন কৃষাণী রোকেয়া আক্তার। রোকেয়া আক্তারের বসতবাড়ি ছাড়া নিজস্ব চাষের কোন জমি না থাকালেও বৈচিত্র্যময় সবজি ও ফল চাষে তার আগ্রহ খুবই বেশি। তিনি বিভিন্ন গ্রাম ও কৃষক পরিবার ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন ধরণের বীজ সংগ্রহ করে নিজে সংরক্ষণ করেন এবং গ্রামের অন্যদের মধ্যে সেসব বীজ বিনামূল্যে বিতরণ করেন। সংগৃহীত সবজি বীজ তিনি গ্রামের যেসব বসতভিটায় খালি জায়গা পান সেসব জমিতে বীজ রোপণ করে আসেন এবং মাঝে মাঝে সেগুলোর যতœ নেন। সবজি সংগ্রহের সময় হলে সেগুলো নিজেও কিছু সংগ্রহ করে খান। বীজ পরিপক্ষ হলে সেখান থেকে বীজ সংগ্রহ করে নিয়ে সংরক্ষণ করেন। তার উৎসাহে গ্রামের দু’টি কৃষক-কৃষাণী সংগঠন যৌথভাবে রোকোয় আক্তারের বাড়ির সামনে একটি গ্রামীণ বীজঘর গড়ে তোলেন। রোকেয়া আক্তার তার সংগৃহীত বীজগুলো এখন বীজঘরে সংরক্ষণ করেন এবং মৌসুম এলে সে বীজঘর থেকে বীজ অন্যদের মধ্যে বিতরণ করেন। বীজঘরের মাধ্যমে গ্রামের অন্যান্য নারী ও কৃষকদের বসতভিটার পতিত জমিতে সবজী চাষের মাধ্যমে জমির সুষ্ঠু ব্যবহার, উৎপাদিত সবজির বীজ সংরক্ষণ, বীজ বিনিময় প্রথার প্রচলন, এলাকায় শস্য ফসলের বীজ বৈচিত্র্যতা বৃদ্ধি, পুষ্টির চাহিদা পূরণ, সংসারের বাড়তি আয় ও নারীর ক্ষমতায়নের উদ্দেশ্যে কাজ করে যাচ্ছেন এই দরিদ্র উদ্যোগী কৃষাণী রোকেয়া আক্তার। সবজি চাষের খুব ইচ্ছা থাকলেও তিনি তার ইচ্ছ কখনো অপূর্ণ রাখেননি। অন্যের বসতভিটায় বীজ রোপণ করে হলেও তিনি তার ইচ্ছা পূরণ করেন।


তার ইচ্ছা ও উদ্যোগ দেখে আকৃষ্ট হয়ে একই গ্রামের ধনী ব্যক্তি সুজন তালুকদার (সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক এবং নেত্রকোনা শহরে বসবাসরত) ভবিষ্যতে নিজের ঘর তৈরির জন্য মাটি কেটে ফেলে রাখা ২৫ শতাংশ ভিটি জমি এবং ১৬০ শতাংশ পুকুর পাড়ে সবজি চাষ করে খাওয়ার জন্য সংগঠনের মাসিক সভায় উপস্থিত থেকে কৃষাণী রোকেয়া আক্তারকে বিনাশর্তে অনুমতি দেন। অনুমতি পেয়ে রোকেয়া আক্তার এখন তার স্বামীর সাথে জমি চাষ করে বৈচিত্র্যময় সবজি উৎপাদন করছেন পুরোদমে। ১৬০ শতাংশ পুকুরের চারপাশে তিনি মাঁচায় ১৪ জাতের শীম চাষ করেছেন। শিমের জাতগুলো হল- আশ্বিনা, কার্তিকা, লাল, রূপবান, কাইক্যা, চেপ্টাশিম, ফুটকা শিম, খৈলসা, গুতুম, কাজলি, গাইডা, সুন্দরী, সাদা, পুলি শিম। এছাড়াও ছোট ছোট বাজার ব্যাগে করে ১১ জাতের বারোমাসি মরিচের চাষ করেছেন। মরিচের জাতগুলো হল- বর্ষা, বালিজুরি, সাদামরিচ, গোলমরিচ, নদারা, কামরাঙ্গা, তেজ, উবদামরিচ সাদা, উবদা মরিচ কালো, গোল সবুজ, গোল কালো মরিচ, গোল সাদা। এছাড়াও তিনি গ্রামের ২০ জন কৃষাণীর মধ্যে এসব মরিচের চারা বিতরণ করেছেন এবং চাষ সম্পর্কে পরামর্শ দিয়েছেন।

বসতভিটার ২৫ শতাংশ জমিতে রোকেয়া আক্তার ১৩ ধরণের সবজি ও ডাল চাষ করেছেন। তার চাষকৃত সবজিগুলো হল- ঢেড়শ, বরবটি, পুইশাক, কুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, মাসকলাই, ডাটা, করলা, চুকাই, কচু, লাউ, বরবটি, বারো মাসী বেগুন। অতিবৃষ্টির ফলে তার চাষকৃত প্রথম ধাপের সবজি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দ্বিতীয়বার তিনি এসব ফসল চাষ করেছেন। ভিটার চারপাশের ঢালে তিনি মাসকলাই বীজ বপন করেছেন। তার বীজঘরে সংগৃহীত বীজ তিনি নিজ গ্রাম ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের ৩০০ পরিবারের মধ্যে বিতরণ করেছেন। উৎপাদিত সবজি দিয়ে নিজের পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রির আয় দিয়ে রোকেয়ার সংসার এখন মোটামুটি ভালোই চলছে।


এ বিষয়ে কৃষাণী রোকেয়া বলেন, ‘আমাদের বীজ আমাদের সম্পদ, আমরাই রক্ষা করব। আমরা সংগঠনের উদ্যোগে গ্রামীণ বীজঘর তৈরি করেছি। বীজের জন্য গ্রামের কৃষকদের যেন চাষাবাদে কোন সমস্যায় পড়তে না হয়। অনেক জাতের সবজি আমি নিজে চাষ করি এবং লোকায়েত পদ্ধতিতে বীজ সংগ্রহ ও বীজ সংরক্ষণ করে বীজঘরে রাখি। বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করে আমরা বাজারের বীজের উপর কৃষকদের নির্ভরশীলতা কমানোর চেষ্টা করছি। সংগঠনের সদস্যরা যার কাছে যে বীজ রয়েছে এবং যে যেখানে যে ভালো জাতের বীজ পায়, তারা সেই সব বীজ বীজঘরে দিয়ে যাচ্ছে। মৌসুমের শুরুতে বীজঘর থেকে কৃষকরা তাদের পছন্দের জাতগুলোর বীজ নিয়ে নিজ নিজ জমিতে চাষ করে। বীজ সংগ্রহ করে তারা পুনরায় বীজঘরে বীজ দিয়ে যায়। এখন আমাদের বীজের জন্য বাজারে তেমন যেতে হয়না। আমি চাষের ২৫ শতাংশ জমি এবং ১৬০ শতাংশ পুকুরের পাড়ের জমি পেয়ে খুবই উপকৃত। এসব জমিতে আমি যেসব ফসল চাষ করেছি তার সবগুলোর বীজ আমি সংরক্ষণ করবো বীজঘরে এবং অন্যদের সাথে বিনিময় করবো।’ তিনি চাষের জন্য জমি দেয়ায় শিক্ষক সুজন তালুকদারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।


রোকেয়া আক্তার পরিবেশবান্ধব উপায়ে শুধুমাত্র জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে সবজি ও অন্যান্য ফসল চাষ করেন। পরিবেশবান্ধব উপায়ে সবজি চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে রোকেয়া আক্তারের পরামর্শ নিয়ে নিজ গ্রাম ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের অনেক কৃষক উপকৃত হয়েছেন ও হচ্ছেন। মাছি পোকা, বিটলপোকার কীড়া ও বিছাপোকা দমনের জন্য নিমপাতা দিয়ে, জাবপোকা ও লালকুমড়া (রেড বিটল) পোকা দমনের জন্য আতা গাছের পাতা দিয়ে জৈব বালাইনাশক তৈরি করে তিনি এবং এলাকার কৃষকরা বেশ উপকৃত হয়েছেন। এভাবে রোকেয়া আক্তার তামাক পাতা, গো-চুনা, মরিচের গুড়া, কেরোসিন ও সাবানের মিশ্রন, ছাই ও কেরোসিন মিশ্রনসহ মোট ২০ ধরণের জৈব বালইনাশক তৈরি করে নিজে ব্যবহার করেন ও অন্য কৃষকদেরও এবিষয়ে পরামর্শ দেন। ফলে পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চার প্রতি নগুয়া ও পাশ্ববর্তী গ্রামের কৃষকেদের আগ্রহ অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে।


রোকেয়া আক্তারের ন্যায় দেশের সকল কৃষক-কৃষাণীরা উদ্যোগী হয়ে তাদের সামান্য জমিতে তাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে বীজ বৈচিত্র্যতা বৃদ্ধি, বীজের জন্য বাজারের উপর নির্ভরশীলতা হ্রাস, পারস্পারিক বীজ বিনিময়, পরিবেশবান্ধব উপায়ে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এগিয়ে আসলে আমাদের গ্রাম বাংলা একদিন সোনার বাংলায় পরিণত হবে। গ্রামীণ জনপদ হবে উন্নত ও স্বনির্ভর জনপদ, দেশ হবে খাদ্যে (নিরাপদ) খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: