এগুলো টিকিয়ে রাখতে হবে আমাদের ভবিষ্যতের জন্য

সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে বিশ্বজিৎ মন্ডল ও রামকৃষ্ণ জোয়ারদার

‘আমি আজ মেলায় ৭২ রকমের কুড়ানো শাক নিয়ে এসেছি। এ শাকগুলো আমাদের এলাকায় হয়। এগুলোর অনেক গুনাগুণ রয়েছে। আমি সবগুলোর গুনাগুণ জানি না এবং চিনি না। আর যেগুলো চিনি বা জানি সেগুলো আমি আমার ঠাকুরমা ও মায়ের কাছ থেকে শিখেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যেমন স্কুলে আমাদের শিক্ষকের কাছ থেকে শিখি তেমনিভাবে বাড়ির লোকের কাছ থেকে শিখেছি। আমাদের এলাকায় যে এখনো এতো রকমের কুড়ানো শাক আছে তা জানতাম না। আজকে এ মেলার মাধ্যমে এ সকল শাকের ব্যবহার ও গুণাবলী জানতে পারলাম। আমাদের প্রকৃতির এ অবাদন থেকে অব্যশ্যই শিক্ষা নিতে হবে এবং এগুলোর যতœ নিতে হবে। এগুলো টিকিয়ে রাখতে হবে ভবিষ্যতের জন্য।’

উপরোক্ত কথাগুলো বলেন কালমেঘা গ্রামের তরুণ শিক্ষার্থী মিনতি রানী মন্ডল। গতকাল বারসিক’র অনুষ্ঠিত পাড়ামেলায় এ কথা বলেন তিনি। বারসিক’র ধারাবাহিক কর্মসূচি পালনের লক্ষ্যে শ্যামনগর উপজেলার কালমেঘা গ্রামে কালমেঘা কৃষি নারী সংগঠনের আয়োজনে ও বারসিক’র সহায়তায় সম্প্রতি উপকূলীয় এলাকায় অচাষকৃত উদ্ভিদবৈচিত্র্য সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে অচাষকৃত এসকল উদ্ভিদের ব্যবহার, গুণাবলী, প্রাপ্তি স্থান সম্পর্কে পরিচিতিকরণের জন্য “অচাষকৃত উদ্ভিদের পাড়া মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মেলায় ৭২ প্রকার উদ্ভিদ প্রদর্শনী করে ১ম হন শিক্ষাথী মিনতি রানী, ৬৮ প্রকার নিয়ে ২য় হয় শিক্ষার্থী ফাল্গুনী রানী এবং ৬৬ নিয়ে ৩য় হন শিক্ষার্থী বন্দনা মন্ডল।

মেলায় কালমেঘা ও চিংড়াখালী গ্রামের কৃষক-কৃষাণী, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, ইউপি সদস্য, শিক্ষার্থী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষক, উপজলো জনসংগঠন সমন্বয় কমিটির সদস্য, যুব টিম এসএসএসটির সদস্য ও বারসিক কর্মকর্তাসহ ৫৩ জন নারী ও ৩৬ জন পুরুষসহ মোট ৮৯ জন অংশগ্রহণ করেন। মেলায় ৫ জন শিক্ষার্থী ও ১৬ জন কৃষাণীসহ মোট ২১ জন অংশগ্রহণকারী তাদের এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত ৭৮ প্রকার কুড়িয়ে পাওয়া শাক ও ঔষধি গাছের স্টল প্রদর্শন করেন এবং এর ব্যবহার, গুনাগুণ, প্রাপ্তিস্থান এবং সময়কাল বর্ণনা করেন।

বর্ণনা পরবর্তী সময়ে বারসিক কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ মন্ডলের সঞ্চালনায় এবং উপজেলা জনসংগঠন সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ সিরাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে সংক্ষিপ্ত এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় কথা বলেন কালমেঘা কৃষি নারী সংগঠনের সভানেত্রী বনশ্রী রানী, শিক্ষার্থী বন্দনা রানী, কৃষাণী অমিতা রানী, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাফুজুর রহমান, ইউপি সদস্য মাছুদুর রহমান, শিক্ষক গোবিন্দ মন্ডল, এসএসএসটির কামরুল ইসলাম ও বারসিক’র রামকৃষ্ণ জোয়ারদার।

পাড়ামেলায় অংশগ্রহণকারী নারীরা জানান, একসময় তাদের এলাকায় প্রচুর পরিমাণে এসকল অচাষকৃত উদ্ভিদ জন্মাতো। এখন তার পরিমাণ কমে গেছে। কারণ এলাকা এখন লবণাক্ততায় আক্রান্ত। অবাধে কৃষি জমিতে লবণ পানি উঠিয়ে চিংড়ি চাষ করা হচ্ছে। আর সে পানি আস্তে আস্তে বসতভিটায় চলে আসছে। যার জন্য প্রকৃতির সকল উপাদান কমে যাচ্ছে। এছাড়াও রাসায়নিক বিভিন্ন ধরনের সার কীটনাশকের ব্যবহার বেড়ে চলেছে। তাদের ছেলে মেয়েরা তো এগুলোর ব্যবহার সম্পর্কে কোন কিছু জানতে পারছে না। কারণ তারা চোখে দেখলে তো শিখবে। তাই এখন যা আছে তা তাদের নিজেদের সচেতনতার মাধ্যমে টিকিয়ে রাখতে হবে। এটা সকলকেই করতে হবে বলে তারা মনে করেন।

আলোচনায় অতিথিবৃন্দ জানান, আগে তাদের এ গাছগুলো চিনতে হবে। আর তা সে অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে। কারণ এগুলো যেমন উপকারী তেমনি আবার ভুল ব্যবহারে ক্ষতির সম্মুখিন হতে হবে। তাই তাদের উচিৎ পাশর্^বর্তী মানুষসহ তাাদের নতুন প্রজন্মকে চেনানো। সাথে বারসিক যে কর্মসূচি আয়োজন করছে তা যেন ধারাবাহিকভাবে করে। অতিথিরা সব রকমের সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দেন।

happy wheels 2

Comments