বৃক্ষসংরক্ষণ ও গবেষণায় ইয়ারব হোসেন

সাতক্ষীরা থেকে মননজয় মন্ডল

পাঠশালা শিক্ষা লাভের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় ও স্থান। আর সেটা হয় যদি গাছের পাঠশালা আর সেখানে যদি প্রকৃতির সকল প্রকার উদ্ভিদ ও বৃক্ষপ্রজাতি সাজানো থাকে তাহলে আর কথাই থাকে না। এমনি এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার তুজলপুর গ্রামে গড়ে উঠেছে বৃক্ষকেন্দ্রিক এক গাছের পাঠশালা। এই গাছের পাঠশালায় প্রায় ছয় শতাধিক বৃক্ষ-প্রজাতি নিয়ে বৃক্ষসংরক্ষণ ও গবেষণা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন সাংবাদিক ইয়ারব হোসেন।

বৃক্ষ সংরক্ষণ ও গবেষণায় ইয়ারব হোসেন (1)

শুনতে অবাক লাগলেও ইয়ারব হোসেন এর সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই গাছের পাঠশালায় মনিরাজ, জটডুমুর, রক্তচন্দন, লালআতা, ডেগোফল, কাজুবাদাম, কনকচাঁপা, কালাপাহাড়, লালসাগর, মৌসন্দেশ কলা, কালিবগ কলা, বট, বাবলা, শিব জটা, লাল সেজে, করবী, লালজবা, টগর, কাঞ্চন, কামিনী, চাঁপা ফুল, লবঙ্গ, এলাচ, ডালচিনি, চুইঝাল, জাফরং, পেপুল, কাটানটে, আমরুল, তেলাকচু, ডুমুর, আতাড়ি পাতাড়ি, লতামুক্তঝুরি, শম্ভুলতা, কৃষ্ণতুলসি, দুধলতা, শিয়াল কাটা, অনন্ত মূল, পাপড়া, শিমুল, জয়তুন, উলটকম্বল, তরুপ চন্দাল, গদপান, সাদা ধুতরা, জষ্ঠিমধু, ডায়াবেটিস গাছসহ ২০৬ প্রজাতির ঔষধি বৃক্ষ, ১০০ প্রজাতির ফলজ বৃক্ষ, ৪৭ প্রজাতির আম, ২০ প্রজাতির কলা, ৫২ প্রজাতির তরকারি ও অচাষকৃত সবজি, ৩৭ প্রজাতির মসলা জাতীয় উদ্ভিদ, ২৪ প্রজাতির ফুল, শোভাবর্ধনকারী ৬৮ প্রজাতির বৃক্ষ, ৬১ প্রজাতির বনজ ও সুন্দরবনের ৯ প্রজাতির বৃক্ষপ্রজাতির সমাহার রয়েছে।

বৃক্ষ সংরক্ষণ ও গবেষণায় ইয়ারব হোসেন (2)

স্থানীয় তুজলপুর কৃষক ক্লাবের সভাপতি ইয়ারব হোসেন তার লীজ নেওয়া ২ বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন গাছের পাঠশালা নামক এই ব্যতিক্রমধর্মী প্রকৃতি শিক্ষা কেন্দ্রটি। যা কিনা সমগ্র জেলায় ইয়ারবের গাছের পাঠশালা হিসেবে এক নামে পরিচিতি পেয়েছে। ইয়ারব হোসেনের গাছের পাঠশালায় ছোট ছোট বোর্ডে লেখা রয়েছে প্রত্যেক প্রজাতির গাছের নামসহ গুণাগুণ। বিনামূল্যে বিতরণের জন্য পাঠশালার এক পাশে উৎপাদন করা হয় বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ, বনজ, ঔষধি, শোভা বর্ধনকারী, অচাষকৃত উদ্ভিদবৈচিত্র্য ও বিলুপ্ত বৃক্ষপ্রজাতি। সুন্দরবনের বৃক্ষ পরিচিতির জন্য রয়েছে সুন্দরবন কর্নার, সেখানে সুন্দরবনের নানা প্রজাতির বৃক্ষপ্রজাতি রয়েছে।

গাছের পাঠশালায় ইয়ারবের গবেষণা সংরক্ষণ উদ্যোগ দেখার জন্য এবং শিক্ষা লাভের আশায় প্রতিদিন দেশ বিদেশ থেকে প্রকৃতিপ্রেমী মানুষেরা ভিড় জমায়। নানা প্রজাতির উদ্ভিদবৈচিত্র্যের সংরক্ষণ ও গবেষণা উদ্যোগ দেখলেই সহজেই অনুমান করা যায় এটি একটি গাছের সংরক্ষণাগার। যারা বেড়াতে আসেন কিংবা প্রকৃতির শিক্ষা লাভের আশায় আসেন তাদের উপহার হিসেবে দেওয়া হয় বৃক্ষের চারা। একই সাথে বিভিন্ন গাছ ও তার গুণাগুণ সম্পর্কে পরিচিতকরণ ও তথ্য তুলে ধরেন ইয়ারব হোসেন। তার এই গবেষণাগারে কেচো কম্পোস্ট ও বিভিন্ন প্রকার জৈব সার তৈরি, সেক্স ফেরোমোন ফাঁদের ব্যবহারের প্রদর্শনীও রয়েছে।

বৃক্ষ সংরক্ষণ ও গবেষণায় ইয়ারব হোসেন (3)

প্রথম পর্যায়ে নামকরণ নিয়ে না ভাবলেও বিলুপ্ত প্রায় উদ্ভিদ ও বৃক্ষপ্রজাতির নাম ও গুনাগুণ জানানোর উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে নাম দেওয়া গাছের পাঠশালার নায়ক ইয়ারবর হোসেন আরো বলেন, “প্রকৃতি থেকে অনেক বৃক্ষরাজি হারিয়ে যাচ্ছে। এগুলো সংরক্ষণ করা দরকার। এছাড়া বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরাও অধিকাংশ গাছ চেনে না। জানে না এসবের উপকারিতা সম্পর্কেও। তাই উদ্যোগটি নিয়েছিলাম।” তিনি আরও বলেন, “এই চিন্তা-চেতনাকে বাস্তবে রূপ দিতে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক)। বারসিক প্রথম থেকেই আমাকে কারিগরি সহযোগিতা করে যাচ্ছে।”
বৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশের ভারসাম্য সুরক্ষা সহ নতুন প্রজন্মের শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ইয়ারব হোসেন এর গাছের পাঠশালাটি বিশেষ ভুমিকা রেখে চলেছে।

happy wheels 2

Comments