Posted in

ধানের পাতা পোড়া রোগের ফলে ধানের বীজ সংরক্ষণ হুমকির মূখে

নেত্রকোনা থেকে শংকর ম্রং

চলতি বছরে অতিবৃষ্টি ও আগাম বন্যা বোরো মৌসুমের ন্যায় আমন মৌসুমের ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। অতিবৃষ্টি ও আগাম বন্যার ফলে সৃষ্ট জলবদ্ধতায় দেশের অনেক এলাকার আমন ধানের জমি তলিয়ে ধান প্রায় সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। বিশেভাবে জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল ও নেত্রকোনা অঞ্চলের অনেক জমির ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে এসব অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা সারাবছরের পরিবারের সদস্যদের খাদ্যের নিরাপত্তার বিষয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। যেটুকু জমির ধান অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেটুকু জমির ধান কৃষকরা ঘরে তোলার আশায় বুক বেঁধে ছিল। কিন্তু সে আশাতেও ছাই ঢেলে দিয়েছে বিভিন্ন রোগ-বালাইয়ের আক্রমণ।

IMG_20171109_062815-W600
এসব এলাকায় ধানের জমিতে যেসব রোগ-বালাই এর প্রার্দুভাব লক্ষ্য করা গেছে তার মধ্যে ধানের পাতা পোড়া রোগ, পাতা মোড়ানো পোকার আক্রমণ ও লিভ ব্লাস্ট রোগ। তবে মহামারী আকারে সংক্রমিত রোগ-বালাইগুলোর মধ্যে রয়েছে ধানের পাতা পোড়া রোগ ও পাতা মোড়ানো পোকার আক্রমণ। কৃষকরা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা ও নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে বিভিন্ন জৈব ও রাসায়নিক উপায়ে এসব রোগ-বালাই দমনের চেষ্টা করে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছেন। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী জমি থেকে পানি বের করে দিয়ে জমি শুকিয়ে ফেলা সম্ভব না হওয়ায় ব্যাক্টেরিয়াজনিত পাতা পোড়া রোগ দ্রুত এলাকার সমস্ত জমিতে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। কৃষি বিভাগের মতে, জমি দীর্ঘদিন জলাবদ্ধ থাকায়, ছায়া থাকায় এবং জমিতে ইউরিয়া সার বেশি পরিমাণে ব্যবহার করায় এসব রোগের সংক্রমণ বেশি হয়েছে।

IMG_20171109_062846-W600
ব্যাক্টেরিয়াজনিত কারণে ধানের পাতার আগা থেকে পোড়ার মতো হয়ে নিচের দিকে নেমে পুরো পাতাটি মরে যাচ্ছে। ধান থোর হওয়া আগ মূহুর্তে পাতা পোড়া রোগটি হওয়ায় ফুল আসার সময়ে গাছের খাদ্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ধানের শীষে ব্যাপক হারে চিটা দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে থোর ও শীষ বের হওয়ার সময়ে রোগগুলো হওয়ায় কৃষকরা জমিতে প্রয়োজনীয় সার ও প্রতিষেধক প্রয়োগ করতে পারছেন না। ফলে একদিকে ধানের ফলন বিপর্যয় এবং অন্যদিকে আগামী মৌসুমের জন্য ধানের বীজ সংরক্ষণ হুমকির মূখে পড়বে বলে আশংকা করা হচ্ছে। কেননা রোগাক্রান্ত ও বালাই আক্রান্ত জমি থেকে বীজ সংগ্রহ করলে পরবর্তী মৌসুমেও এই রোগগুলো ধানের জমিতে দেখা যাবে এবং কৃষকরা সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

IMG_20171109_070506-W600
বীজ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কৃষকদের একমাত্র ভরসা হবে বহুজাতিক কোম্পানির ও বিএডিসি’র বীজ। বিএডিসি যেহেতু এদেশে এবং একই আবহাওয়ায় বীজ উৎপাদন করে এবং বাংলাদেশের সকল বিএডিসি’র খামারগুলোতেও যে এসব রোগ-বালাই সংক্রমিত হয়নি তারও নিশ্চয়তা নেই। নেত্রকোনা শহরে অবস্থিত বিএডিসি’র ধানের খামার পরিদর্শন করে দেখা যায়, বীজ বর্ধনের জন্য খামারে চাষকৃত ব্রি-৩২, ব্রি-১০, ব্রি-৫২সহ প্রায় সকল ব্রি জাতীয় ধানেই পাতা পোড়া রোগ মহামারী আকারে সংক্রমিত হয়েছে। শুধুমাত্র ব্রি-৩৪ ও চিনিগুড়া ধান রোগ-বালাইমুক্ত ও অক্ষত আছে। ব্রি-১০ ও ব্রি-৫২ জাতের ধানে পাতা পোড়া রোগের আক্রমণ সবচেয়ে বেশি হয়েছে। ব্রি-১০ জতের ধানটি মাত্র থোর হওয়া পর্যায়ে আছে, এক-দু’টি করে শীষ বের হয়ে থমকে আছে। তাই প্রায় ২৫ একর জমিতে চাষকৃত ব্রি-১০ জাতের ধানের শীষ আদৌ বের হবে কিনা সে বিষয়ে খামারে কর্মরত শ্রমিকরা শংকিত। ব্রি-১০ ধানের শতভাগ গাছ এবং পাতার ৭০ ভাগ অংশই পাতা পোড়া রোগে আক্রান্ত। এমতাবস্থায় বিএডিসিও চলতি মৌসুমে ধানের বীজ সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। ফলে আগামী আমন মৌসুমে ধানের বীজের জন্য কৃষকদেরকে মহাসংকটে পড়তে হবে। তবে ব্রি জাতীয় ধানেই এই রোগগুলো বেশি লক্ষ্য করা গেছে, স্থানীয় জাতের ধানে এরোগের সংক্রমণ খুবই সামান্য।

IMG_20171109_065624-W600
আগামী আমন মৌসুমে ধানের বীজের সংকট মোকাবেলা তাই এখনই বিএডিসি, কৃষি বিভাগ, কৃষক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে যেসব অঞ্চলে কৃষকদের জমিতে এবং যেসব জাতের ধান রোগমুক্ত সেসব অঞ্চলের কৃষকদের নিকট থেকে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে মানসম্মত ধান ক্রয় করে বীজের জন্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। অথবা সংশ্লিষ্ট কৃষকদেরকে রোগ-বালাইমুক্ত ধানের জমি থেকে বীজ সংরক্ষণের জন্য উদ্বুদ্ধ করা এবং আক্রান্ত জমি থেকে বীজ সংগ্রহ না করার জন্য কৃষকদেরকে সচেতন করা। আগামী বোরো মৌসুমের জন্য রোগ-বালাই আক্রন্ত জমি পরিশোধনের পদ্ধতি সম্পর্কে কৃষকদের পরামর্শ প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.